স্টাফ রিপোর্টার,১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ (বিবিনিউজ) : রাজধানী ঢাকার উপকন্ঠে অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগামের শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনারের গৌরবের অর্জন করেছে। মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মাসে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত করা হচ্ছে এই একুশে ও একাত্তরের পাদদেশকে। ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭২ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। তাই ৩০ লাখ শহীদের এই আত্মত্যাগের আবেগও জড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে। এই মহান স্থাপনার কিছু কাজ বাকি আছে। দ্রূত এই অসমাপ্ত কাজ সমাধানেরদাবিও করেছেন সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা।

ক্যাম্পাসের কেন্দ্রস্থল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিক অনুষদের সামনে এই শহীদ মিনার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশ দিয়ে চলে গেছে ত্রিকোণাকার রাস্তা । যা এই সুউচ্চ শহীদ মিনারকে করেছে আরো সৌন্দর্যমন্ডিত। পুরো শহীদ মিনার প্রাঙ্গণটি সবুজ ঘাসে ও বাহারী রঙের ফুল গাছে আচ্ছাদিত। রাস্তার পাশের উঁচু উঁচু বৃক্ষের ডালপালার আচ্ছাদনে বর্ণিল হয়ে ওঠে স্থানটি। শহীদ মিনারটির স্থপতি শিল্পী রবিউল হোসাইন।
১৯৫২ সালের সকল অর্জনের ভিত্তি বিবেচনা করে শহীদ মিনারটির ভিত্তিমঞ্চের ব্যাস রাখা হয়েছে ৫২ ফুট এবং ১৯৭১ সালের অবিস্মরণীয় মর্যাদার প্রতি সম্মান জানিয়ে ভিত্তিমঞ্চ থেকে উন্মুক্ত ঊর্ধ্বগামী স্তম্ভত্রয়ের উচ্চতা রাখা হয়েছে ৭১ ফুট। ১৯৪৭,১৯৫২,১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১ কে শ্রদ্ধা নিবেদন করে ভিত্তি মঞ্চে ব্যবহার করা হয়েছে আটটি সিঁড়ি যা এর ধারাবহিকতার প্রতীক। ঊর্ধ্বগামী স্তম্ভের তিনটির একটি বাংলাভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, দ্বিতীয়টি মাটি-মানুষ,প্রতিবাদ-প্রতিরোধ,আন্দোলন-সংগ্রাম এবং তৃতীয়টি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দৃঢ়তার প্রতীক ত্রিভুজাকৃতির ঋজু কাঠামোর মিনারের স্থাপত্য শৈলীতে বিধৃত হয়েছে সেইসব জাতীয় বীরদের বীরত্বগাথা যারা মায়ের ভাষা, ভূমির জন্য যূথবদ্ধ হয়ে লড়েছেন, জীবন দিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি এ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, সবুজে আচ্ছাদিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতি প্রেমীদের এক আরাধ্য স্থান। এই নৈসর্গের ভেতরই সংস্কৃতির দীপ্ত পথচলা। ক্যাম্পাসের ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে শহীদ মিনারের সম্পূর্ণ অংশটিতেই লাল ইটের ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় জীবনে জ্বলন্ত অগ্নিশিখায় উজ্জ্বল এবং রক্তাক্ত আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। আর এ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদ ভাষা সৈনিকদের স্মরণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার।

ভাষা শহীদের স্মরণে নির্মিত শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর সম্মানের উদ্দেশে নির্মিত হলেও বর্তমানে এর যথাযথ মান রাখা হচ্ছে না। বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িড এ স্থাপত্যের মর্যাদা শুধু চোখে পড়ে একুশে ফেব্রুয়ারিতেই। ভাষা দিবসের আগে শহীদ মিনার ধুয়ে মুছে পরিষ্কার ও আলোকসজ্জা এবং নিরাপত্তা বাড়ানো হলেও বছরজুড়েই থাকে অরক্ষিত অবস্থায়।
নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় শহীদ মিনারের মূল বেদিতে গিয়ে মানুষজন ছবি তুলে, আড্ডা দেয়, গানের আসর বসান। তবে মূল বেদিতে জুতা নিয়ে ওঠা কিংবা বসা নিয়ে মাঝে মাঝে সচেতন শিক্ষার্থীদের সাথে বাগ-বির্তকও হয় । কেউ কেউ আবার শহীদ মিনারে পালন করে জন্মদিনের অনুষ্ঠান। অধিকাংশ সময় রাতে বসে ভিন্ন ধরনের আসর। নিরাপত্তার জন্য লাইটের ব্যবস্থা থাকলেও অনেক সময় তা নষ্ট করে দেয় মাদকসেবীরা।
শহীদ মিনারের ভাবমূর্তি এবং মর্যাদা ক্ষুন্নের বিষয়ে উদ্বেগ ও অসমাপাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য দাবী জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।
সারা বছরই অবহেলার স্বীকার এই শহীদ মিনার। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত বহিরাগত আগমন, তাদের শহীদ মিনারের মূল বেদিতে জুতা পায়ে বসে থাকা। শহীদ মিনার আমাদের মাথানত না করার শিক্ষা দেয়, তাই আমাদের সবার জায়গা থেকে আরও বেশি সচেতনতা প্রয়োজন এবং সে সঙ্গে সবার আরও পবিত্রতা রক্ষায় সেসঙ্গে মনেপ্রাণে একুশের চেতনা ধারণ করা আবশ্যক।
ভাষা শহীদদের নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো নির্মিত হয়েছে একুশের পাদদেশ ভাষস্কার্ষ, শহীদ সালাম-বরকত হল এবং শহীদ রফিক –জব্বারহল। এখানেও শিক্ষার্থীরা অবস্থান করে খুশী ।
আইন অনুষদ এর ডিন অধ্যাপক ড. মোঃ রবিউর ইসলাম বলেন, শহীদ মিনার আমাদের দীর্ঘ সংগ্রাম, স্বায়ত্তশাসনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতীক। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে যারা ভূমিকা রেখেছে, যারা মাতৃভাষার দাবিতে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছে তাদের স্মরণে যে মিনার গড়ে তোলা হয়েছে তার রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বের সাথে সম্মান করা জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান বলেন, দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনারটি ২০০৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক খন্দকার মুস্তাাহিদুর রহমান উদ্বোধন করেন। ৭১ ফুট উচ্চতা ও ৫২ ফুট ব্যাসের এই শহীদ মিনারের স্থপতি রবিউল হুসাইন। আটটি সিঁড়ির ওপর ত্রিভুজাকৃতির তিনটি স্তম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এ মিনারটি। স্তম্ভ তিনটি ভাষা দিবস ও স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদদের ত্যাগের মহিমা প্রকাশ করছে। বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত দেশের সবচেয়ে বড় শহীদ মিনারের অবস্থান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে । নিরাপত্তার ব্যবস্থাসহ অসমাপাপ্ত কাজও শেষ করা হবে।
প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও শ্রদ্ধাজানানোসহ শহীদ মিনারের ভাবমূর্তি ,নিরাপত্তা জোরদার এবং অসমাপ্রাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করবে কর্তৃপক্ষ এমটিই প্রত্যাশা সাধারনের।
